ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার অন্যতম জনপ্রিয় আয়োজন ‘এ সিজন অব বাংলা ড্রামা’ আবারও ফিরছে টাওয়ার হ্যামলেটসে। আগামী ১ থেকে ২৯ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত মাসব্যাপী এই নাট্যোৎসবে মঞ্চস্থ হবে ১২টি মৌলিক নাট্যপ্রযোজনা। পাশাপাশি দর্শকদের অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে থাকছে ৩০টিরও বেশি পার্শ্ব-অনুষ্ঠান।
এ বছরের উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য ‘কৌতূহল’ (কিউরিওসিটি)। এই ভাবনাকে কেন্দ্র করে নাট্যকারেরা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর বিষয় থেকে শুরু করে আধুনিক জীবনের নানা দিক নিয়ে হালকা মেজাজের ব্যঙ্গাত্মক নাটক পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল কাজ উপস্থাপন করছেন। উৎসবের মাধ্যমে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি গল্প বলার সমৃদ্ধি, বৈচিত্র্য এবং সময়ের সঙ্গে এর বিবর্তন তুলে ধরা হবে।
দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নাট্যদল, নতুন প্রজন্মের শিল্পী এবং বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠন এই উৎসবে একত্রিত হচ্ছে। তাঁদের পরিবেশনা ও আয়োজনের মধ্য দিয়ে পূর্ব লন্ডনের কয়েক দশকের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হবে। পরিচয়, অভিবাসন, আপনজন ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক, পারিবারিক গোপন ইতিহাস এবং জীবনের পরিবর্তন - এবারের মূল মঞ্চের নাটকগুলোতে এসব বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সমসাময়িক সমাজে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় উৎসবটি দর্শকদের নতুনভাবে ভাবতে ও প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করবে।
ব্র্যাডি আর্টস সেন্টার, আর্টসওয়ান, কবি নজরুল সেন্টার, রুট/২৫ এবং বিভিন্ন পাবলিক স্পেস বা জনপরিসরসহ একাধিক স্থানে উৎসবের আয়োজন করা হবে। বিভিন্ন পটভূমির দর্শকদের জন্য এই আয়োজন পূর্ব লন্ডনের মানুষের জীবন, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানার সুযোগ তৈরি করবে। ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সমাজের বহুভাষিক বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিয়ে নাটক ও অন্যান্য পরিবেশনায় বাংলা, ইংরেজি, সিলেটি এবং আরও কয়েকটি ভাষা ব্যবহার করা হবে।
টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুৎফুর রহমান বলেন, “২৩ বছর ধরে ‘এ সিজন অব বাংলা ড্রামা’ আমাদের প্রাণবন্ত ব্রিটিশ-বাংলাদেশি কমিউনিটির এক অনন্য উদ্যাপন এবং টাওয়ার হ্যামলেটসের সাংস্কৃতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে। এই উৎসব প্রতিষ্ঠিত ও নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ করে দিচ্ছে। একই সঙ্গে লন্ডনের বিভিন্ন এলাকার দর্শকদের বাংলা সংস্কৃতির সমৃদ্ধির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।""
মেয়র আরও বলেন, “আমি আশা করি, বরো এবং এর বাইরের দর্শকেরা এই অনন্য ও বৈচিত্র্যময় আয়োজন উপভোগ করবেন, কৌতূহলকে স্বাগত জানাবেন, নতুন গল্প আবিষ্কার করবেন এবং নাটক ও সৃজনশীলতার এই বিশেষ মাসজুড়ে মানুষের সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলবেন।”
‘এ সিজন অব বাংলা ড্রামা ২০২৬’-এর সূচনা হবে ‘ন্যারেটিভস অব টাইম’ দিয়ে। ন্যাশনাল লটারি হেরিটেজ ফান্ডের অর্থায়নে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ নাট্যসংকলনে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি নাট্যচর্চা এবং পূর্ব লন্ডনের কমিউনিটি জীবনের ছয় দশকের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ব্রিটেনে বাংলা নাটকের বিকাশ, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং কমিউনিটির অভিজ্ঞতার দীর্ঘ যাত্রা দর্শকদের সামনে উপস্থাপিত হবে।
উৎসবের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য প্রযোজনার মধ্যে রয়েছে ‘উই ডোন্ট সে হার নেম’। বাংলা ভাষার সরাসরি সংগীত ও বিভিন্ন প্রজন্মের অভিজ্ঞতাভিত্তিক গল্প বলার সমন্বয়ে নির্মিত এই দ্বিভাষিক নাটক পারিবারিক সম্পর্ক ও স্মৃতির নানা দিক তুলে ধরবে।
‘ওল্ড গেট’ নাটকে বয়স বাড়ার অভিজ্ঞতা এবং সমাজে নিজের অবস্থান ও অন্তর্ভুক্তির অনুভূতি অনুসন্ধান করা হয়েছে। ‘আই হিয়ার হামিং’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় নারীদের জীবনের আড়ালে থাকা ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরবে। অন্যদিকে, ‘টু আম্মি, উইথ লাভ’ একজন অভিবাসী মায়ের জীবন, মাতৃত্ব এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্মিত এক আবেগঘন একক নাট্যপ্রযোজনা।
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের লেইজার, কালচার এন্ড ট্যুরিজম বিষয়ক কেবিনেট সদস্য কাউন্সিলর মিনারা খাতুন বলেন, “এ সিজন অব বাংলা ড্রামা কেবল একটি উৎসব নয়। গত ছয় দশকে ব্রিটেনে বাংলা গল্প ও নাট্যচর্চার জন্য জায়গা তৈরি করেছেন যেসব শিল্পী, আয়োজক এবং কমিউনিটির মানুষ, এই উৎসব তাঁদের অবদানকে সম্মান জানায়। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে।"
তিনি বলেন, “কৌতুক, নাটক, নৃত্যনাট্য, আবৃত্তি ও কথ্য কবিতা এবং ধ্রুপদি গল্পের সমসাময়িক পুনর্ব্যাখ্যাসহ নানা ধরনের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এই আয়োজন আমাদের বহুভাষিক সংস্কৃতিকে উদ্যাপন করে। এর মাধ্যমে পূর্ব লন্ডনের বিভিন্ন কমিউনিটির মানুষের বাস্তব জীবন ও অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটে।”
মূল মঞ্চের নাটকগুলোর পাশাপাশি উৎসবের বিস্তৃত পার্শ্ব-আয়োজনেও দর্শকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। এসব আয়োজনের মধ্যে রয়েছে নাটক লেখা ও অভিনয়ের কর্মশালা, গল্প বলার অধিবেশন, দ্বিভাষিক কবিতা কর্মশালা, ফ্যাশন ইলাস্ট্রেশন, ঐতিহ্যবিষয়ক পদযাত্রা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, শিল্পকলা ও হস্তশিল্পের কর্মশালা, কমিউনিটির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা, উন্মুক্ত মঞ্চে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অংশগ্রহণের উপযোগী সৃজনশীল কার্যক্রম।
উৎসবের অনেক অনুষ্ঠান বিনামূল্যে উপভোগ করা যাবে। কিছু অনুষ্ঠানে দর্শকেরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিতে পারবেন। এর মাধ্যমে আয়োজকেরা বিভিন্ন আর্থিক ও সামাজিক পটভূমির মানুষের জন্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সহজলভ্য রাখার প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন।
১ থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত চলা এই মাসব্যাপী আয়োজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সৃজনশীলতার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বাংলা নাটকের নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাজ উপভোগ করার সুযোগ করে দেবে।
অনুষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ সূচি, স্থান, সময় এবং টিকিট বা বুকিং-সংক্রান্ত তথ্য জানতে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের ওয়েবসাইট দেখুন: A Season of Bangla Drama








